নিজস্ব প্রতিবেদক | ২ এপ্রিল, ২০২৬
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) তার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। অশোধিত তেলের (Crude Oil) মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসায় আগামী ৬ এপ্রিলের পর শোধনাগারটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে আমদানিকৃত তেলের জাহাজ সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিপিসি ও ইআরএল-এর কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত শোধনাগারে ব্যবহারযোগ্য অশোধিত তেলের মজুদ ছিল প্রায় ৩০,৫০০ টন। প্রতিদিন ৪,৫০০ টন সক্ষমতায় শোধনাগারটি চললে এই মজুদ দিয়ে মাত্র ৬ দিন কাজ চালানো সম্ভব। পরিস্থিতি সামাল দিতে বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন কমিয়ে ৩,৭০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছে।
জ্বালানি মজুদের বর্তমান চিত্র (৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত)
শোধনাগার বন্ধের আশঙ্কায় বাজারে পেট্রোল ও অকটেনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে সরকারি মজুদের চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| জ্বালানির ধরন | বর্তমান মজুদ (মেট্রিক টন) | কতদিনের চাহিদা মেটাবে |
| অকটেনে | ৯,৪০৭ টন | ৮-৯ দিন |
| পেট্রোল | ১২,৮১০ টন | ৮-৯ দিন |
| ডিজেল | ১২৭,৮১০ টন | ১০ দিন |
| জেট ফুয়েল/ফার্নেস অয়েল | পর্যাপ্ত | পুরো এপ্রিল মাস |
কেন এই সংকট?
১. হরমুজ প্রণালীতে বাধা: ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল সংকুচিত হয়েছে। মার্চ মাসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসার কথা থাকা ২ লাখ টন তেলের দুটি চালান আটকে গেছে।
২. বিকল্প উৎসের অভাব: ইআরএল-এর বর্তমান প্রযুক্তি শুধুমাত্র ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’ এবং ‘মুরবান’ তেল শোধন করতে সক্ষম। ফলে দ্রুত অন্য কোনো দেশ থেকে তেল কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
৩. রিফাইনারি ২ প্রকল্পের বিলম্ব: দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ইআরএল ইউনিট-২ প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়ায় দেশীয় শোধন সক্ষমতা বাড়েনি, যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
আশার আলো: পাইপলাইনে থাকা জ্বালানি
বিপিসি জানিয়েছে, শোধনাগার বন্ধ হলেও পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে সংকট কাটানোর চেষ্টা চলছে:
ডিজেল: মালয়েশিয়া থেকে ২৭,০০০ টন ডিজেল পৌঁছেছে; ৭ এপ্রিলের মধ্যে আরও ৩০,০০০ টন আসার কথা।
অকটেন: ২৫,০০০ টনের একটি চালান ৭ এপ্রিল পৌঁছাবে।
দেশীয় উৎপাদন: সিলেট গ্যাস ফিল্ড থেকে প্রতিদিন ৭২০ ব্যারেল অকটেন এবং ৩,৩১৮ ব্যারেল পেট্রোল উৎপাদিত হচ্ছে, যা একটি বাফার হিসেবে কাজ করছে।
রাজধানীর ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি
সরকার আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানালেও রাজধানীর মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকার ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। মহাখালীর ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গাড়ির লাইন রেলগেট পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। মূলত ‘Precautionary Buying’ বা আগেভাগেই কিনে রাখার প্রবণতার কারণে এই ভিড় বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
“ইআরএল বন্ধ হওয়া নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে, তবে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত। এপ্রিল মাসের জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে, তাই সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।”
— মনির হোসেন চৌধুরী, মুখপাত্র, জ্বালানি বিভাগ।
