শায়েস্তাগঞ্জে বিউটি ধর্ষণ ও হত্যার রহস্য উদঘাটন ॥ আদালতে লোমহর্ষক জবানবন্দি

মোঃ আক্তার হোসেন ॥ শায়েস্তাগঞ্জে আলোচিত কিশোরী বিউটি আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়েছে। প্রথম দফায় দায়ের করা ধর্ষণ মামলার সাক্ষী ময়না মিয়া ঘটনার সাথে জড়িত বলে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিলে এ রহস্য উদঘাটন হয়। বিউটি হত্যায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দিতে তিনি লোমহর্ষক তথ্য দিয়েছেন। সেই সাথে ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকা-ে ব্যবহৃত ছোড়াটি উদ্ধার করা হয়। গতকাল শুক্রবার বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ৩ ঘণ্টাব্যাপী হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলামের আদালতে ময়না মিয়ার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। একটি সূত্র জানায়, গত ১৬ মার্চ রাতে ময়না মিয়া ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিউটিকে হত্যা করে কাঁধে তুলে লাশ পুরাইকলা হাওরে নিয়ে ফেলে দেন। তার দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী হত্যাকা-ে ব্যবহৃত ছোড়াটি গত বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। সূত্র আরো জানায়, গত ইউপি নির্বাচনে বাবুলের মা কলম চাঁন বিবির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ময়না মিয়ার স্ত্রী আসমা আক্তার। এতে কলম চাঁন বিবি জয়ী হন। নির্বাচনের পূর্বে কলম চাঁন বিবিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করতে বারণ করেন ময়না মিয়া। কিন্তু কলম চাঁন তা না শুনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। মূলত এ আক্রোশ থেকেই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন ময়না মিয়া। পাশাপাশি বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বিউটির নানী সাক্ষি ফাতেমা বেগমের জবানবন্দি আদালত রেকর্ড করেন। তিনি আদালতকে জানান, গত ১৬ মার্চ রাতে বিউটির পিতা সায়েদ আলী তাদের বাড়ি থেকে বিউটিকে নিয়ে আসে। এ সময় বাবুল সেখানে ছিল না বলে তিনি জানান। বিউটির নানী আরো জানান, বিউটির নিকটাত্মীয় চাচা ময়না মিয়া বিষয়টি সামাজিকভাবে মিমাংসা করবেন এবং বাবুলের সাথে বিয়ে দিবেন মর্মে সায়েদ আলীকে দিয়ে বিউটিকে গুণীপুর থেকে নিয়ে আসেন। এছাড়া রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত মুল অভিযুক্ত বাবুল মিয়াও স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগে বিউটির পিতা সায়েদ আলী ও মা হোসনে আরাসহ ৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে প্রশাসনের কেউই এ বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করেননি। এ ব্যাপারে আজ শনিবার সাংবাদিকদের প্রেস ব্রিফিং করা হতে পারে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশের একটি সুত্র। আদালত পরিদর্শক ওহিদুর রহমান জবানবন্দির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে তিনি এর বেশি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে পুলিশ সুপার সাংবাদিকদের সাথে আজ শনিবার ব্রিফিং করে সব জানাবেন। গত সোমবার বাবুল মিয়াকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। প্রসঙ্গত, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের সায়েদ আলীর কন্যা বিউটি আক্তারকে (১৬) গত ২১ জানুয়ারি ধর্ষণ করে একই গ্রামের ইউপি মেম্বার কলম চান বিবির পুত্র বাবুল মিয়া। এ ঘটনায় গত ৪ মার্চ হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে বাবুল ও তার মা কলম চান বিবির বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন সায়েদ আলী। ওই মামলায় সাক্ষী করা হয় সায়েদ আলীর ঘনিষ্ট আত্মীয় ময়না মিয়াকে। এ ঘটনার পরই বিউটিকে পাঠিয়ে দেয়া হয় লাখাই উপজেলার গুণিপুর গ্রামে তার নানার বাড়িতে। গত ১৬ মার্চ রাতে সেখান থেকে নিখোঁজ হয় বিউটি। পরদিন গত ১৭ মার্চ গুণিপুর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে পুরাইকলা হাওরে তার মরদেহ পাওয়া যায়। তার শরীরের একাধিক স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পায় পুলিশ। এ ঘটনায় গত ১৮ মার্চ বিউটির পিতা সায়েদ আলী বাদী হয়ে একই গ্রামের বাবুল মিয়া (৩২) ও তার মা ইউপি সদস্য কলম চান বিবিকে (৪৫) আসামি করে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর অভিযান চালিয়ে কলম চান বিবিকে শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রীজ এবং বাবুলের বন্ধু ইসমাইল মিয়াকে অলিপুর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ৩০ মার্চ সিলেট থেকে গ্রেফতার করা হয় বাবুল মিয়াকেও। হত্যাকা-ের ঘটনাটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিবাদের ঝড় উঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ গণমাধ্যমে। ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠে সারাদেশ। পুলিশও হত্যার মোটিভ উদঘাটনে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রথম দফায় তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করা হয়। বদল করা হয় তদন্তকারী কর্মকর্তা। দ্বিতীয় দফায় চাঞ্চল্যকর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) মানিকুল ইসলাম। দায়িত্ব নেয়ার কয়েকদিনের মাঝেই তিনি মোটিভ উদঘাটনে সক্ষম হন। বাবুল ও তার মা কলম চান বিবিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বিউটির পিতা, মা, মামা, নানিসহ স্বজন ও নিকটাত্মীয়দের। অবশেষে গত বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় দায়েরকৃত ধর্ষণ মামলার সাক্ষী ময়না মিয়াকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসব জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে আসে হত্যার মোটিভ। শেষ পর্যন্ত ময়না মিয়া হত্যাকা-ে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। প্রকাশ করেন জড়িত অন্যান্যদের নামও। বাবুলের মা ইউপি সদস্য কলম চান বিবি, বাবুল ও ময়না মিয়াকে গতকাল শুক্রবার রাতে কারাগারে পাঠানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *