নপোলে বমিান বধ্বিস্ত ॥ রাগীব রাবয়ো মডেকিলেরে ১৩ শক্ষর্িাথীসহ নহিত ৪৯

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকা থেকে নেপালের কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে কমপক্ষে ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। চার জন ক্রুসহ বিমানে ৭১ জন আরোহী ছিলেন। তাদের মধ্যে দুই জন ছাড়া অন্যান্য যাত্রী বাংলাদেশ ও নেপালের নাগরিক। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অন্তত ৪৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে নেপালের গণমাধ্যম ও হাসপাতাল সূত্র। আহত ২২ জনকে কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের কয়েকজনের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। চিকিৎসাধীন যাত্রীদের নাম পাওয়া গেলেও নিহতদের বিস্তারিত তথ্য নেপাল ও ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ জানাতে পারেনি। নেপালে বাংলাদেশি বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার পর দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাগড়া প্রসাদ শর্ম ওলি। ঘটনা অনুসন্ধানে কমিটি করেছে নেপাল কর্তৃপক্ষ। এদিকে ইউএস বাংলার বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার পর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান উঠানামা বন্ধ করে চালানো হয় উদ্ধার তৎপরতা। কী কারণে বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে তার বিস্তারিত তথ্য না পেলেও নেপালের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে বিমানের পাইলট নির্দেশনা না মেনে ভুল দিক থেকে অবতরণ করেছিলেন। পাল্টা অভিযোগ করে ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেয়া হয়েছিল। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেলা ১২টা ৫২ মিনিটে ইউএস বাংলার ফ্লাইট বিএস ২১১ রওনা দিয়ে নেপাল সময় বেলা ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে। এ সময় বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। টেলিভিশন ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায় আগুনে বিমানের পিছনের ডানা ও সামনের কিছু অংশ ছাড়া পুরো বিমান পুড়ে যায়। নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ডিজি সঞ্জিব গওতমের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, ড্যাস-৮ কিউ ৪০০ মডেলের ওই উড়োজাহাজ ত্রিভুবনে নামার কথা ছিল রানওয়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে। কিন্তু সেটি নামার চেষ্টা করে উত্তর দিক দিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, পাইলট কোনো ধরনের কারিগরি জটিলতায় পড়েছিলেন। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা উদ্ধার তৎপরতায় নামেন। এ কাজে যোগ দেয় নেপালের সেনাবাহিনীও। আহতদের উদ্ধার করে নেয়া হয় কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ, টিচিং হাসপাতাল, নোরভিচ হাসপাতাল ও মেডিসিটি হাসপাতালে। হাসপাতালে নেয়ার পর আটজনের মৃত্যু হয়। বিধ্বস্ত বিমানটির ব্লাকবক্স উদ্ধার করা হয়েছে। বিমানের যাত্রীদের মধ্যে ৩২ জন বাংলাদেশি, ৩৩ জন নেপালি এবং চীন ও মালদ্বীপের একজন করে নাগরিক ছিলেন। নেপালি নাগরিকদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন সিলেটের রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। ফাইনাল পরীক্ষা শেষে ছুটি কাটাতে একসঙ্গে দেশে ফিরছিলেন। তাদের মধ্যে দুই জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১১ জন মেয়ে ও দুইজন ছেলে বলে জানা গেছে। গতকাল সোমবার বিকেলে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করলেও শিক্ষার্থীদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত কোন তথ্য দিতে পারেনি। বাংলাদেশি বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অবস্থা নিয়ে রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বিরাজ করছে। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিধ্বস্ত হওয়া বিমানে যাত্রী হিসেবে ছিলেন সঞ্জয় পৌডেল, সঞ্জয়া মহারজন, নেগা মহারজন, অঞ্জলি শ্রেষ্ঠ, পূর্নিমা লোহানি, শ্রেতা থাপা, মিলি মহারজন, শর্মা শ্রেষ্ঠ, আলজিরা বারাল, চুরু বারাল, শামিরা বেনজারখার, আশ্রা শখিয়া ও প্রিঞ্চি ধনি। মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাঃ মোঃ আবেদ হোসেন বলেন, বিধ্বস্ত হওয়া বিমানে আমাদের কিছু শিক্ষার্থী ছিলো বলে শুনেছি। তবে কতজন ছিলো তা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। নেপালে অবস্থানরত আমাদের সাবেক একজন ছাত্রের মাধ্যমে পুরো বিষয় জানার চেষ্টা করছি। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ছাড়াও নগরীর বেসরকারি অন্য পাঁচটি মেডিকেল কলেজে কয়েক শ’ নেপালি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। বিমানটি যখন আছড়ে পড়ে তখন নিজের বাসভবন থেকে এ দৃশ্য দেখছিলেন আমান্ডা সামারস। তিনি বলেছেন, ঘটনার সময় বিমানটি অনেক নিচু দিয়ে উড়ছিল। মনে হচ্ছিল, তা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে উড়ে যাবে। বিমানটি রানওয়ে স্পর্শ করেছিল কিনা সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তিনি বলেছেন, অকস্মাৎ তাতে একটি ‘ব্লাস্ট’ হলো। এরপর আরো একটা। ওদিকে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজ কুমার ছেত্রি দ্য হিমালয়া’কে বলেছেন, বিধ্বস্ত বিমানের পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে। বিমানটির অবতরণ করার কথা ছিল রানওয়ে-২ তে। এটি বিমানবন্দরের দক্ষিণ দিকে। বিমানটির করুণ পরিণতি ভোগ করার কয়েক মুহূর্তে এ ঘটনা ঘটে। এরপরই পাইলট জানান, তিনি উত্তর দিকের রানওয়েতে যেতে চান। কিন্তু বিমানটি তার পরিবর্তে যেতে থাকে উত্তর-পূর্ব দিকে। এ সময় পাইলটের সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে যোগযোগ করা হয়। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কোনো সমস্যা আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, সবকিছু ঠিক আছে। ওদিকে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ফলে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট বাতিল করা হয়। খবর পেয়ে বিমানবন্দরে ছুটে যান নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঈশ্বর পোখরেল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাম বাহাদুর থাপা এবং নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস। নেপালি কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা রাম চন্দ্র পাউদেলও বিমানবন্দরে যান। প্রধানমন্ত্রী কেপি ওলি প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন। যারা জীবিত আছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন। দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দিতে একটি প্রতিনিধি দল ও চিকিৎসা সামগ্রী পাঠানোর কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সিঙ্গাপুর সফর সংক্ষিপ্ত করে আজ দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাতে দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন করে দুর্ঘটনার বিস্তারিত জানায় ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ দেয়া তথ্য অনুযায়ী বিমানের পাইলট আবিদ সুলতান প্রাণে বেঁচে যান। তবে অন্য তিন ক্রু নিখোঁজ ছিলেন। ইউএস বাংলার প্রধান নির্বাহী ইমরান আসিফ ব্রিফিং এ বলেন, বিমানটি অবতরণের আগে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেয়া হয়েছিল কন্ট্রোল রুম থেকে। এদিকে ইউএস বাংলা জানিয়েছে, ওই বিমানের যাত্রীদের স্বজনদের নিয়ে আজ সকালে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু একটি বিশেষ ফ্লাইট যাবে। ওই ফ্লাইটে পাসপোর্ট থাকা স্বজনরা ইউএস বাংলার তত্ত্বাবধানে সেখানে যেতে পারবেন। এ ছাড়া তাদের কার্যালয় থেকেও সর্বশেষ তথ্য সব সময় জানা যাবে। এদিকে রাতে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বারিধারার কার্যালয়ে যান ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, বিমানে ৩৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিমানের প্রত্যেক যাত্রী বিমানের আওতায় ছিলেন। এ ছাড়া তারা জানিয়েছে, নিহতদের লাশ তারা নিজ ব্যবস্থাপনায় দেশে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করবে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে কমিটি করার জন্য বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রীর প্রতিও আহ্বান জানান তিনি। ডাক্তার, ওষুধ নিয়ে ঢাকা থেকে বিমান যাচ্ছে ঃ এদিকে বিমান দুর্ঘটনার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাতে প্রতিমন্ত্রী জানান, তারা যে তথ্য পেয়েছেন তাতে পাইলট, কো-পাইলট, কেবিন ক্রুসহ ৭১ আরোহীর মধ্যে ৪১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বাকি ২০ জনের মধ্যে চার জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। ১৬ জন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছে। ঘটনার পর এখন সরকার কি করছে জানাতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জরুরি চিকিৎসা সেবা নিয়ে নেপালে যেতে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ বিমান। সেখানে ডাক্তার, মেডিসিন, নার্স যাবে। নেপালের রানওয়ে বন্ধ রয়েছে, এটি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যাবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র আরো জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাগড়া প্রসাদ শর্মা ওলি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেন। সিঙ্গাপুর সফররত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সে সময় একটি বৈঠকে থাকায় ফোন ধরতে পারেন নি। পরে অবশ্য দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কথা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওদিকে ইউএস বাংলা সূত্র জানিয়েছে, বিধ্বস্ত ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। নেপালের পুলিশ বিবিসিকে জানিয়েছে, ৩১ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। আরো ৯ জন পরে হাসাপাতালে মারা গেছেন। তবে, নিহতদের কতজন কোন দেশের সেটা এখনো জানা যায়নি। নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ বাংলাদেশি একজন যাত্রী জানিয়েছেন, বিমানটি রানওয়েতে নামতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর বিবিসিকে তিনি বলেন, অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানটি কাঁপছিল। তারপরই তিনি দেখতে পান, হঠাৎ একসময় তাতে আগুন ধরে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী বাংলাদেশি ছাত্র আশীষ কুমার সরকার বলেন, তিনি বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন বাংলাদেশে ফেরার জন্যে। ইউএস বাংলার ওই বিমানে করেই তার ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *